বাংলাদেশ এখন এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক চাপ, জনস্বাস্থ্য সংকট এবং সামাজিক-মানবাধিকার চ্যালেঞ্জ—সবকিছু মিলে দেশবাসীর জীবনযাত্রায় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তবুও এই অন্ধকারের মাঝেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনার আলো খোঁজা জরুরি।
রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি
রাজবাড়ি ও হাটহাজারিতে সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা স্বীকার করেছেন সরকারের হোম অ্যাফেয়ার্স উপদেষ্টা। যদিও তিনি সহিংসতা দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি এখনও অস্থির। ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন ও শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক বছর পরও রাজনৈতিক স্থিতি ফিরেনি। ইন্টারিম প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচন ও প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার নিয়ে চাপের মুখে আছেন। রাজনৈতিক বিভাজন গভীর হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে—দেশ কোন পথে এগোবে?
অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
অর্থনৈতিক অস্থিরতাও সমানভাবে স্পষ্ট। মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণসাপেক্ষ বৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.৯৫%-এ, যা গত ২১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৩% আর IMF ৩.৮% পূর্বাভাস দিয়েছে—যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায়ও কম।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, নন-পারফর্মিং লোনের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। এই সংকট মোকাবিলায় সংস্কার জরুরি, তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনৈতিক পদক্ষেপকে ধীর করছে।
জনস্বাস্থ্য সংকট
রাজনীতি ও অর্থনীতির বাইরে বাংলাদেশ এখন স্বাস্থ্য খাতেও এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া সংক্রমণ ভয়াবহ আকার নিয়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই কেবল ঢাকায় ১,৫০০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি এবং ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ধারণক্ষমতার তিনগুণ রোগী নিয়ে চরম চাপের মধ্যে রয়েছে।
চট্টগ্রামসহ অন্যান্য অঞ্চলেও আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য খাতের সীমাবদ্ধতা এ সংকটে প্রকট হয়ে উঠেছে। জনগণের মনে আতঙ্ক, আর সরকারের সামনে এখনই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ।
সামাজিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি
অন্যদিকে সামাজিক বাস্তবতাও জটিল হয়ে উঠছে। মোব সহিংসতা, স্বেচ্ছাচারী আইন প্রয়োগ, সাংবাদিকদের স্বাধীনতায় বাধা—এসব ঘটনা গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও পরিচয়পত্র বাতিলের ঘটনা স্বাধীন গণমাধ্যমের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলছে।
এছাড়া "অপারেশন ডেভিল হান্ট" নামে পরিচালিত অভিযানে হাজার হাজার প্রাক্তন রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একইসাথে রোহিঙ্গা সংকট এখনো অমীমাংসিত, যা মানবিক দায়িত্বের পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপও তৈরি করছে।
ভবিষ্যতের পথ
বাংলাদেশের বর্তমান সংকটগুলো পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অর্থনৈতিক সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করছে, স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা জনগণের আস্থা কমাচ্ছে, আর সামাজিক-মানবাধিকার সংকট আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তবে সংকটের মধ্যেই সম্ভাবনার ইঙ্গিতও আছে। শক্তিশালী নির্বাচন প্রক্রিয়া, অর্থনৈতিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, জনস্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আবারও আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, আজকের বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এ পথ থেকে হয়তো আরও অন্ধকারের দিকে যাওয়া সম্ভব, আবার নতুন করে আলোর দিকেও এগোনো সম্ভব। মূল প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র ও সমাজ কি সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে জনগণের আস্থা ফেরাতে পারবে? নাকি অনিশ্চয়তাই হয়ে উঠবে বাংলাদেশের নতুন পরিচয়?
লেখক: নিপুণ চন্দ্র, মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক বর্তমান বাংলা