৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০২:৪৩ পি.এম

৩৩ বছর পর উদ্ধার ‘এমবি মোস্তাবি’ প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক অভিঘাতের গভীর বিশ্লেষণ

৩৩ বছর পর উদ্ধার ‘এমবি মোস্তাবি’ প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক অভিঘাতের গভীর বিশ্লেষণ

বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীর বুক থেকে ৩৩ বছর পর উঠল জাপানি পণ্যবাহী জাহাজ ‘এমবি মোস্তাবি’। ১৯৯২ সালে ঝড়ের কবলে ডুবে যাওয়া এ জাহাজ বহুবার উদ্ধারের চেষ্টা হলেও ব্যর্থ হয়। দীর্ঘ সময় নদীর তলদেশে শুয়ে থাকার পর সম্প্রতি চর খনন করে অবশেষে এটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এ উদ্ধার কার্যক্রম শুধু একটি যান্ত্রিক সাফল্য নয়—বরং স্থানীয় সমাজ, অর্থনীতি ও প্রজন্মের স্মৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।

জাপানি ইঞ্জিন ও কাঠামোর স্থায়িত্বের প্রমাণ
উদ্ধারকারীদের ভাষ্য, তিন দশক পানির নিচে থাকার পরও জাহাজের কাঠামো অনেকাংশে অক্ষত রয়েছে। বিশেষত ইঞ্জিন ও ধাতব প্লেটের গুণমান গবেষকদেরও বিস্মিত করেছে। জাপানি জাহাজ ও ইঞ্জিন দীর্ঘস্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতার জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত।
আন্তর্জাতিক নৌবিষয়ক জার্নালে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮০–৯০ দশকের জাপানি শিপইয়ার্ডগুলোতে তৈরি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে উচ্চমানের স্টিল ও ক্ষয়রোধী প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতো। ‘এমবি মোস্তাবি’র উদ্ধারের পরও এর স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে।

সামাজিক কৌতূহল থেকে মিলনমেলা
মিঠুয়া গ্রামসংলগ্ন চর এলাকায় উদ্ধারের দিন হাজারো মানুষ ভিড় করে। স্থানীয়রা জানান, তাদের শৈশব-কৈশোর জুড়ে এই জাহাজ ছিল গল্পের অংশ। কেউ একে ভয়ঙ্কর, কেউবা রহস্যময় ধনভাণ্ডার হিসেবে কল্পনা করতেন।
উদ্ধারের দিন গ্রামবাসীর সেই দীর্ঘ কৌতূহল বাস্তবে রূপ নেয়। প্রবীণদের মতে, এটি ছিল “প্রজন্মের গল্পের সঙ্গে বাস্তবতার মেলবন্ধন।”

অর্থনীতি ও স্থানীয় প্রভাব
জাহাজের ধাতব কাঠামো ও ইঞ্জিনসহ মূল্যবান যন্ত্রাংশ উদ্ধারকারীরা ভাঙারি বাজারে বিক্রি করবেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক ব্যবস্থাপনায় এ জাহাজ থেকে কোটি টাকার সম্পদ উদ্ধার সম্ভব।
স্থানীয়দের অনেকে দাবি করেছেন, উদ্ধারকাজ পর্যটন সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। তেঁতুলিয়া নদীঘেঁষা এ গ্রামকে “ডুবে যাওয়া জাহাজের গ্রাম” হিসেবে ব্র্যান্ড করা গেলে ছোট পরিসরে পর্যটক আকর্ষণ করা যেতে পারে।

প্রযুক্তি, শ্রম আর অধ্যবসায়
উদ্ধারকাজে ব্যবহার করা হয় শক্তিশালী বার্জ, আধুনিক ক্রেন ও শতাধিক শ্রমিক। এক যুগ ধরে প্রচেষ্টা চালানো ইউসুফ মিয়ার দল অবশেষে সফল হয়। দীর্ঘদিন ধরে নদীতে ডুবে থাকা জাহাজ উত্তোলনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শ্রমিক আব্দুল মান্নান মৃধা বলেন, “এটি শুধু একটি যান্ত্রিক কাজ নয়, ধৈর্য আর আত্মবিশ্বাসেরও পরীক্ষা।”

নীতিগত প্রশ্ন
বিআইডব্লিউটিএ’র নিয়ম অনুযায়ী, ব্যক্তিমালিকানাধীন জাহাজ ডুবে গেলে তিনবার নোটিশ দিয়ে তা উদ্ধার করতে বলা হয়। সাড়া না পেলে নিলামে তোলা হয়। ২০০৫ সালে নিলামে বিক্রি হলেও প্রায় দুই দশক পর জাহাজটি উদ্ধার হলো। এ অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে নদীপথে ডুবে যাওয়া অন্যান্য নৌযান উদ্ধারে নতুন নীতিগত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনছে।

উপসংহার
‘এমবি মোস্তাবি’ কেবল একটি জাহাজ নয়; এটি তিন দশক ধরে মানুষের স্মৃতি, কৌতূহল ও জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক প্রতীক। এটির উদ্ধারে প্রযুক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি সামাজিক একতার চিত্রও ফুটে উঠেছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও অধ্যবসায়ের ফলেই সম্ভব হয়েছে এই উদ্ধার। এখন প্রশ্ন হলো—এ জাহাজ কি কেবল ভাঙারির বাজারেই শেষ হবে, নাকি গবেষণা ও পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি করে সমাজকে নতুন কিছু দেবে?