ইতিহাসের অপ্রত্যাশিত বাঁক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য শুধু ক্যাম্পাস–কেন্দ্রিক ঘটনা নয়; এটি জাতীয় রাজনীতিরও প্রতিফলন। স্বাধীনতার পর থেকে ডাকসু হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। এখানে জয়–পরাজয় অনেক সময় ভবিষ্যৎ জাতীয় রাজনীতির গতিপথ নির্দেশ করে।
২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচন সেই ইতিহাসে নতুন মোড় এনেছে। কারণ, এ নির্বাচনেই প্রথমবারের মতো ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থীরা ভিপি, জিএস ও এজিএস পদে জয় পেয়েছে। এটি যেমন এক অভূতপূর্ব ঘটনা, তেমনি দেশের ছাত্ররাজনীতির চেহারায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ডাকসুর নেতৃত্বে কারা ছিলেন?
ডাকসুর ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মূলত তিন ছাত্রসংগঠন—
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ – স্বাধীনতার পর প্রথম দশকগুলোতে একচেটিয়া আধিপত্য।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন – বিশেষত ষাট–সত্তরের দশকে বামপন্থী রাজনীতির ঘাঁটি।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল (ছাত্রদল) – আশির দশকের পর থেকে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বড় শক্তি হয়ে ওঠা।
এই ধারায় জামায়াত–সমর্থিত ইসলামী ছাত্রশিবির কখনো ডাকসুর শীর্ষ পদে নির্বাচিত হয়নি। বিভিন্ন হলে সামান্য উপস্থিতি থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে তাদের প্রভাব খুব সীমিত ছিল। এমনকি ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনেও তারা কোনো উল্লেখযোগ্য প্রার্থী দাঁড় করাতে পারেনি।
তাই ২০২৫ সালের নির্বাচন যে ফলাফল দেখিয়েছে, তা ইতিহাসে এক বিরাট ব্যতিক্রম।
নির্বাচনের ফলাফল: কে কোথায় কত ভোট পেলেন?
ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়—
ভিপি পদে: ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থী সাদিক কায়েম পেয়েছেন প্রায় ১৪ হাজার ৪২ ভোট, যেখানে ছাত্রদল সমর্থিত আবিদুল ইসলাম খান পেয়েছেন মাত্র ৫ হাজার ৭০৮ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী উমামা ফাতেমা পেয়েছেন ৩ হাজার ৩৮৯ ভোট এবং শামীম হোসেন পেয়েছেন ৩ হাজার ৮৮৪ ভোট।
জিএস পদে: শিবিরের এস এম ফরহাদ পেয়েছেন ১০ হাজার ৭৯৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের তানভীর বারী হামিম পেয়েছেন ৫ হাজার ২৮৩ ভোট। প্রতিরোধ পর্ষদের মেঘমল্লার বসু পেয়েছেন ৪ হাজার ৯৪৯ ভোট।
এজিএস পদে: শিবিরের মুহা. মহিউদ্দীন খান জয়ী হয়েছেন ১১ হাজার ৭৭২ ভোট পেয়ে। ছাত্রদলের প্রার্থী মায়েদ পেয়েছেন মাত্র ৫ হাজার ৬৪ ভোট।
অর্থাৎ, তিনটি প্রধান পদেই ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রার্থীরা সুস্পষ্ট ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
ইসলামী ছাত্ররাজনীতির উত্থান: নতুন রেনেসাঁ?
এই নির্বাচনে শিবিরের জয়কে অনেকে বলছেন ইসলামী ছাত্ররাজনীতির এক ধরনের “জাগরণ”। দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় দমননীতি, নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, সংগঠন নিষিদ্ধের দাবির মুখেও তারা মাঠে টিকে ছিল।
শিবিরের এই সাফল্যকে দুইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়—
সংগঠনের ধৈর্য ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা: শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, ইসলামী আদর্শভিত্তিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও মাদ্রাসা–বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগ তাদের ভোটব্যাংক গড়ে তুলেছে।
বিকল্প রাজনীতির খোঁজ: ছাত্রলীগ দীর্ঘদিন অনুপস্থিত, ছাত্রদল দখল রাজনীতি ও সহিংসতায় জড়িয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ইসলামী রাজনীতিকে “সততার প্রতীক” হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, এটি কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামী রেনেসাঁর সূচনা? নাকি শুধুই এক নির্বাচনী অঘটন?
ছাত্রদলের ভরাডুবি: কেন হারলেন আবিদ?
ছাত্রদলের প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খানকে ঘিরে শুরু থেকেই প্রত্যাশা ছিল। বিএনপি–ঘনিষ্ঠ অনেক শিক্ষকও তাকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু ভোটের মাঠে বাস্তবতা ভিন্ন।
কারণগুলো হলোঃ
দখল রাজনীতি ও সন্ত্রাসী ইমেজ: দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসে বিএনপি–ছাত্রদলকে ঘিরে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার অভিযোগ ছিল। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ নিয়ে বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়।
সংগঠনের দুর্বলতা: মাঠপর্যায়ে ছাত্রদল নতুন প্রজন্মকে আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়। তাদের আন্দোলন অনেক সময় কেবল প্রেসক্লাব–কেন্দ্রিক থেকে গেছে।
অভ্যন্তরীণ বিভাজন: তানভীর বারী হামিম ও আবিদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ফলে ছাত্রদলের ভোটব্যাংক ভেঙে পড়ে এবং শিবিরের সংগঠিত প্রচারণার কাছে তারা পরাজিত হয়।
স্বতন্ত্র প্রার্থীরা: বিকল্পের স্বপ্ন
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে উমামা ফাতেমা ও শামীম হোসেন যথেষ্ট ভোট পেয়েছেন।
উমামা পেয়েছেন ৩ হাজার ৩৮৯ ভোট।
শামীম পেয়েছেন ৩ হাজার ৮৮৪ ভোট।
তাদের ভোট প্রমাণ করে, ছাত্ররা মূলধারার রাজনীতির বাইরে বিকল্প নেতৃত্ব খুঁজছে। বিশেষ করে নারী প্রার্থী উমামার ভোট একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
অভিযোগ ও উত্তেজনা: নির্বাচন পরবর্তী চিত্র
নির্বাচন ঘিরে প্রতিরোধ পর্ষদ ও ছাত্রদল উভয়েই অভিযোগ করেছে যে ক্যাম্পাসে যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিরোধ পর্ষদের প্রার্থী তাসনিম আফরোজ ইমি অভিযোগ করেন, নির্বাচনী আচরণবিধি মানা হয়নি এবং প্রশাসন পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছে।
অন্যদিকে, ছাত্রদলের প্রার্থীরা এ নির্বাচনকে “পরিকল্পিত প্রহসন” বলে আখ্যা দেন।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা নির্দ্বিধায় ভোট দিয়েছেন এবং ফলাফল স্পষ্টভাবে ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষে গেছে।
ঢাকার আবহ: থমথমে রাত
ফল ঘোষণার সময় ঢাকার পরিবেশ ছিল অস্বাভাবিক। সিনেট ভবনের সামনে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অপেক্ষা করছিলেন, বাইরে সাধারণ মানুষও আগ্রহ নিয়ে খোঁজ নিচ্ছিলেন।
রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের অবস্থান যাচাই করছিল। কেউ বলছিল এটি ছাত্রদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, কেউ আবার বলছিল এটি বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: দক্ষিণ এশিয়ার ছাত্ররাজনীতি
বাংলাদেশের এই নির্বাচনকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যেতে পারে।
নেপাল: ছাত্র সংগঠনগুলো জাতীয় রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
পাকিস্তান: ইসলামী ছাত্র সংগঠনগুলোর ঘাঁটি রয়েছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে শক্তিশালী।
মঙ্গোলিয়া: ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে।
তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের জয়কে কেউ কেউ আঞ্চলিক প্রবণতার অংশ হিসেবেও দেখছেন।
ভবিষ্যৎ প্রভাব: সামনে কী?
এই নির্বাচনের ফলাফল তিনটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—
বাংলাদেশের মূল রাজনীতিতে ইসলামী শক্তির ভূমিকা বাড়বে কি?
ছাত্রদল কি নিজেদের পুনর্গঠন করতে পারবে, নাকি আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বে?
স্বতন্ত্র ও বিকল্প শক্তির উত্থান কতটা বাস্তবসম্মত হবে?
সবশেষে বলা যায়, ডাকসু নির্বাচন ২০২৫ শুধু একটি ক্যাম্পাসভিত্তিক প্রতিযোগিতা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ রূপরেখার একটি ইঙ্গিত। ইসলামী ছাত্ররাজনীতির উত্থানকে কেউ রেনেসাঁ বলবেন, কেউ আবার বলবেন মূলধারার রাজনৈতিক ব্যর্থতার ফসল। তবে এটুকু নিশ্চিত—বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে এটি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
লেখক: নিপুণ চন্দ্র, মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক বর্তমান বাংলা