১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৯:৪৯ এ.এম

নদীভাঙন, পরিত্যক্ত ভবন ও শিশুদের আত্মমর্যাদা: শিক্ষার ক্রান্তিকাল

নদীভাঙন, পরিত্যক্ত ভবন ও শিশুদের আত্মমর্যাদা: শিক্ষার ক্রান্তিকাল

“আমরা সবসময় ভয়ে থাকি” — সাদিয়া খাতুন, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী, ১৩ নম্বর চরঘোষপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল ও চর এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই নদী ভাঙন ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কবলে। এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যালয় স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও মানসম্মত শিক্ষার দাবিতে শিশু ও অভিভাবকরা প্রায়শই ভয় ও অব্যক্ত উদ্বেগের মধ্যে দিন গুজরান করেন। কুষ্টিয়ার চরঘোষপুরের ঘটনার মতো উদাহরণ তারই প্রমাণ, যেখানে নদীর ভাঙন ও ভবনের অবস্থা শিশুদের শিক্ষা, জীবন ও মনোজগতে গভীর প্রভাব ফেলছে।

চরঘোষপুর: বাস্তবতার আয়নায়
ভঙ্গুর কাঠামো ও অস্থায়ী আশ্রয়
চরঘোষপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রথম পাকা ভবন বিলীন হওয়ার পর, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলছে একটি বিত্যর্কভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, ২৩ বছর পরিত্যক্ত কমিউনিটি স্কুল ভবনে। ভবনটি শুধু পুরোনো নয়, দরজা-জানালা, দেয়াল, ছাদসহ নানা দিক থেকে অপর্যাপ্ত ও বিপজ্জনক।

শ্রেণিকক্ষ সংকট ও বেড়ে চলা শিক্ষার্থীর সংখ্যা
স্থানান্তরের ফলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১০৬ থেকে ৩০৫ জন, কিন্তু শ্রেণিকক্ষ মাত্র দুটি টুকরো কক্ষ এবং সংকীর্ণ সিঁড়িঘর। এর ফলে কিছু শ্রেণি পড়তে হচ্ছে অসমঞ্জস্যপূর্ণ পরিস্থিতিতে, শিক্ষার্থীর মনোযোগ খাটো হচ্ছে, শিক্ষকের চাপ বাড়ছে।

মানসিক স্বাস্থ্য ও ভয়
নদী ভাঙন আতঙ্ক মানবিকভাবে শিশুদের মনে “নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি” জন্মায়। সাদিয়া বলছেন, “মাথার ওপর ইট, বালু, সিমেন্ট খসে খসে পড়ে” — এই ধরনের ভয়ের পরিবেশ শিশুদের মনকে শান্ত থাকতে দেয় না, তারা অবিরত উদ্বিগ্ন থাকে। অপর ছাত্র নিরব হোসেন জানায়, “পড়াশোনা, চলাফেরা খুবই সমস্যা হয়” — অর্থাৎ শুধু শারীরিক নয়, মনস্তাত্ত্বিক ও মনোযোগ-সংক্রান্ত সমস্যা ওহে দেখা দিচ্ছে।

বড় বাধা: শিশুদের মানসিক ও শিক্ষাগত প্রভাব
প্রতিদিন ভয়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া
শিশুদের মনে ভয় বা উদ্বেগ দীর্ঘস্থায়ী হলে শিখনক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও ক্রিয়াশীল мышনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহ, স্কুল এড়িয়ে চলার প্রবণতা, ক্লাসে মনোযোগ কমে যাওয়া—এসব ঘটতে পারে।

শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকি
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, বিকল জানালা দরজা, টুঙ্গুন সিঁড়ি, ছাদ ফাটল, বৃষ্টির পানি প্রবেশ ও আদ্রতা—এসব শারীরিক রোগের (দান্ত, চোখ, নিউমোনিয়ার মতো) ঝুঁকি বাড়ায়।

শিক্ষাগত উৎকর্ষ ও সুযোগের ঘাটতি
শ্রেণিকক্ষ ও পাঠদান যন্ত্রপাতি কম, অধ্যাপকদের চাপ বেড়ে যাওয়া, সময় অনুযায়ী পাঠসূচী বজায় রাখতে না পারা—এসব কারণে পড়ায় পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

নদী ভাঙন ও শিক্ষার ক্ষতি
সিরাজগঞ্জের চৌহালি উপজেলায় দেখা গেছে, স্কুলের অধিকাংশ পুরোনো ভবন নদী ভাঙনের কবলে পড়েছে। বহু বিদ্যালয় বারবার স্থানান্তর করতে হচ্ছে; এর ফলে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমছে ও পড়া প্রকাশে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। 

শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, ৭-১৭ বছরের শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রায় ১৪ শতাংশ হালকা থেকে গুরুতর মানসিক অসুস্থতার সম্মুখীন; অর্থাৎ উদ্বেগ, ভয়, মনঃসংযোগ বা অন্য মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা রয়েছে। অভিভাবকদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—তারা যদি অগ্রিম সতর্ক থাকেন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত থাকেন, তাহলে শিশুর ভেতরের ক্ষতি কম হতে পারে। 

প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বন্যা ও বাধ্যতামূলক পরিস্থিতে হঠাৎ ছাড়পত্র
কেশবপুর উপজেলায় বন্যার পর স্কুলগামী শিশুদের পড়াশোনা ও স্বাস্থ্য একসাথে প্রভাবিত হয়; অনেক শিশু স্কুলে যেতে পারে না, স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগে। 

সুপারিশ: ফিরে আসা শিক্ষার অধিকার ও শান্তির পরিবেশ
চরঘোষপুরের মতো ভাঙনকবলিত এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো একটি নিরাপদ, টেকসই ও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষসংবলিত ভবন নির্মাণ করা। শুধুমাত্র একটি ভবন নয়, স্থাপত্য নকশায় নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় বিদ্যালয় পর্যায়ে সচেতনতা কর্মশালা, শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনে স্কুল কাউন্সেলিং সেবা চালু করা দরকার।

পাঠদানের পরিবেশও উন্নত করতে হবে। যথেষ্ট শ্রেণিকক্ষ, আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা, নিরাপদ সিঁড়ি ও দরজা-জানালা, টেবিল-চেয়ার ও অন্যান্য উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা নদীভাঙনের মতো বিপর্যয়ের আগে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা দপ্তর ও কমিউনিটির মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে।

সবশেষে, এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বিদ্যালয়গুলোর জন্য বিশেষ নীতি নির্দেশনা ও বাজেট বরাদ্দ থাকা জরুরি। জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হবে নিয়মিত নিরীক্ষণ করা এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণ করা। কেবল তখনই শিশুদের জন্য নিরাপদ, মানসম্মত ও শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হবে।

পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষার অধিকার কেবল পাঠ্যক্রম, পরীক্ষার ফল ও বইয়ের উপর নির্ভর করে না; সেটি নির্ভর করে নিরাপত্তা, মানসিক শান্তি ও একটি প্রাণবন্ত, সুরক্ষিত পরিবেশের ওপর।

চরঘোষপুরের শিশুদের ভয়, অভিভাবকদের উদ্বেগ ও শিক্ষকদের কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়েই রচিত হচ্ছে একটা গল্প—যেখানে শিক্ষার আগুন এখনও জ্বলে আছে, কিন্তু পঞ্ছ রোদ বা নদীর স্রোত সেই আগুন নেমিয়ে দেবে কি না, তা অনেকটাই এখনো অনিশ্চিত। আমাদের প্রয়োজন সক্রিয় উদ্যোগ—ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, অর্থায়নে প্রবল মনোযোগ, এবং সব শ্রেণির শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, মানসম্মত শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করা।