বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার বিশেষ সুযোগ দিয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বিদ্যমান খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে গ্রাহককে ন্যূনতম ২ শতাংশ নগদ অর্থ জমা দিতে হবে। এতে ঋণ নিয়মিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদে কিস্তি করে পরিশোধ করা যাবে। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ শুরু করার আগে দুই বছরের বিরতি সুবিধাও (গ্রেস পিরিয়ড) দেওয়া হবে।
গতকাল মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ এ–সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
কেন এ সুবিধা
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে ব্যর্থ হয়েছে। এতে তারা ঋণের কিস্তি পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়ে। ব্যাংকের ঋণ আদায় কার্যক্রমও ব্যাহত হয়, যা সামগ্রিক অর্থনীতি ও আর্থিক খাতকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এ অবস্থায় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
যেসব সুবিধা পাওয়া যাবে
২% নগদ জমা: খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে হবে।
১০ বছর মেয়াদ: দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ সময়।
অতিরিক্ত শর্ত: আগে তিনবার বা তার বেশি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়ে থাকলে অতিরিক্ত ১% অর্থ জমা দিতে হবে।
সময়সীমা: সুবিধা নিতে হলে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদন করতে হবে।
এককালীন নিষ্পত্তি: গ্রাহকেরা চাইলে এক বছরের মধ্যে ঋণ এককালীন পরিশোধ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
মামলা স্থগিত: সুবিধা পাওয়ার পর ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে চলমান মামলা ৯০ দিনের মধ্যে স্থগিত করতে হবে।
তবে নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, জালিয়াতি, প্রতারণা বা ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা এ সুবিধার আওতায় আসবে না।
খেলাপি ঋণের বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ২৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। শুধু এক বছরেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি।
বিশেষজ্ঞ মত
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেছেন, “ভালো ব্যবসায়ীদের অনেকেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে খেলাপি হয়েছেন। তাঁদের জন্য এই সুবিধা প্রয়োজন ছিল। এতে তাঁরা ব্যবসায় ফিরতে পারবেন বা ব্যবসা বাড়াতে পারবেন। অনেক রাজনীতিবিদও সুবিধা পাবেন। সামনে নির্বাচন—তাই সবাই ঋণ নিয়মিত করার চেষ্টা করবেন। যদিও স্বাভাবিক সময়ে ব্যাংকের জন্য এত ছাড় কঠিন হতো, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্তটি যথাযথ।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন নীতি একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীকে স্বস্তি দেবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে বেড়ে চলা খেলাপি ঋণের চাপ কিছুটা কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঋণ সুবিধার কার্যকর প্রয়োগ ও অনিয়ম প্রতিরোধ নিশ্চিত না হলে ব্যাংক খাত আরও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।