১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৩৫ পি.এম

মার্কিন নাগরিক (ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা) ‘র’- পরিচয়ে প্রতারণা

মার্কিন নাগরিক (ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা) ‘র’- পরিচয়ে প্রতারণা

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক এনায়েত করিম চৌধুরী ওরফে মাসুদ করিম, যিনি নিজেকে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা দাবি করে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন, তাকে গত শনিবার (৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫) রাজধানীর মিন্টো রোড থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে রমনা থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে, এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এই মামলার তদন্ত করছে। আদালত তাকে ৪৮ ঘণ্টার রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছে।

এনায়েত করিম ৬ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর পুলিশের একজন পদস্থ কর্মকর্তা তাকে আনতে বিমানবন্দরে যান। এরপর পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার আরেক কর্মকর্তা তাঁর নিরাপত্তার জন্য নিজের দেহরক্ষীকে (একজন পুলিশ সদস্য) নিয়োজিত করেন। গ্রেপ্তারের সময় ওই দেহরক্ষী এনায়েত করিমের সঙ্গে ছিলেন, যিনি ডিআইজির নির্দেশে কাজ করছিলেন বলে জানিয়েছেন। ওই দেহরক্ষীকে ইতিমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে ডিআইজির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

এনায়েত করিম ঢাকায় আসার পর দুদিন একটি পাঁচ তারকা হোটেলে (সোনারগাঁও হোটেল) অবস্থান করেন। এই হোটেলের বুকিং ও ভাড়া পরিশোধ করেন জাতীয় পার্টির (রওশনপন্থী) মহাসচিব পরিচয় দেওয়া কাজী মামুনুর রশিদ। তিনি দাবি করেছেন, এনায়েত করিমের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে, এবং এই সম্পর্কের কারণেই তিনি হোটেল বুকিং ও ভাড়া পরিশোধ করেছেন। তিনি আরও বলেন, জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গেও এনায়েত করিমের সখ্য ছিল। তবে, এনায়েত করিমের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা পরিচয় বা প্রতারণার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানায়, এনায়েত করিম গত ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজেকে একটি প্রভাবশালী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএর দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান) পরিচয় দিয়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছেন। তিনি কখনো ক্ষমতায় বসানোর স্বপ্ন দেখিয়ে, কখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল ডিনারে আমন্ত্রণের প্রলোভন দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন: এই দুটি জাতীয় নির্বাচনের আগে তিনি বিভিন্ন নেতার কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৮ সালের পর: বিএনপিপন্থী এক সাংবাদিক নেতা এবং নবগঠিত একটি দলের নেতার (যিনি পরে দলটি ছেড়ে যান) সঙ্গে সখ্য গড়ে প্রতারণা অব্যাহত রাখেন।
২০২১ সালে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: র‍্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারির সময় সরকার পরিবর্তনের আভাস দিয়ে তিনি কারও কারও কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধ: একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত একজনকে বাঁচানোর আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এর আগে, ২০০১-০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তাকে প্রতারণা ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এনায়েত করিম দাবি করেছেন, তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল করতে এবং একটি নতুন জাতীয় সরকার গঠনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার নাজুক অবস্থায় রয়েছে এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে এর দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তিনি সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন। তবে, তাঁর আইনজীবীরা দাবি করেছেন, তিনি কোনো ষড়যন্ত্রে জড়িত নন এবং বাংলাদেশে পারিবারিক কারণে এসেছিলেন।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, এনায়েত করিমকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের তথ্য পাওয়া গেছে। তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। তবে এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, এনায়েত করিমের দুটি মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে, যেগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা করে আরও তথ্য পাওয়া যাবে।

গ্রেপ্তারের পর এনায়েত করিমকে ৫৪ ধারায় আটক দেখানো হয়, এবং পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়। আদালতে পুলিশ ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করলেও, আদালত ৪৮ ঘণ্টার রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি ‘র’-এর (ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা) এজেন্ট হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং বর্তমান সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে জড়িত।
এনায়েত করিমের গ্রেপ্তার ঘিরে উঠে আসা তথ্যগুলো গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। একজন মার্কিন নাগরিকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা ও রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার জড়িত থাকার বিষয় এবং জাতীয় পার্টির একজন নেতার আর্থিক সহায়তা প্রদানের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। তবে, কাজী মামুনুর রশিদের দাবি অনুযায়ী, তিনি শুধু পারিবারিক সম্পর্কের কারণে এনায়েত করিমকে সহায়তা করেছেন, যা তদন্তে প্রমাণিত হওয়া জরুরি।
এনায়েত করিমের দাবি, তিনি সরকার পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে এসেছেন, এবং তাঁর সঙ্গে সরকারি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বৈঠকের তথ্য যদি সত্যি হয়, তবে এটি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাঁর ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ থেকে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে, যা এই ঘটনার পেছনের পুরো চিত্র উন্মোচন করবে।
এই ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নও তুলেছে। ডিআইজির দেহরক্ষী সাময়িক বরখাস্ত হলেও, ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতের চূড়ান্ত রায় এই বিষয়ে স্পষ্টতা আনবে বলে আশা করা যায়।