২৫ আগস্ট ২০২৫, ০৫:৩১ পি.এম

ট্রাম্পের কূটনীতি এবং ইউক্রেইনে শান্তির পথে যত বাধা

ট্রাম্পের কূটনীতি এবং ইউক্রেইনে শান্তির পথে যত বাধা

রুশ-ইউক্রেইন যুদ্ধ বন্ধের জন্য ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রচেষ্টা এখন বিশ্ববাসীর মনোযোগের কেন্দ্রে। আলাস্কায় ভ্লাদিমির পুতিনকে লাল গালিচায় অভ্যর্থনা জানিয়ে, হোয়াইট হাউসে সাতজন খ্যাতনামা ইউরোপীয় নেতার উপস্থিতিতে ইউক্রেইন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে আন্তরিক আলোচনা—এসবই ট্রাম্পকে বিশ্বমঞ্চের কেন্দ্রে এনে ফেলেছে। তার রাজনৈতিক জীবনে এই প্রথম তাকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ দেখা যাচ্ছে এবং তাকে যথেষ্ট আন্তরিক বলেও মনে হচ্ছে। তবে খুব শক্তিশালী অবশ্যই নন।


জন জে. মিয়ারশাইমার ‘ডেমোক্রেসি নাও’-এর এমি গুডম্যানের সঙ্গে আলোচনায় ট্রাম্পকে অসহায় হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, ট্রাম্প সত্যিই ভালো কোনো ফলাফল অর্জনের চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছেন না, এটাই স্পষ্ট।

স্পষ্টতর হচ্ছে আলাস্কায় ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের বৈঠকের আলোচনা প্রকাশ হওয়ার পর। পুতিন ইউক্রেইনের কাছে তিনটি দাবি করছেন। আর তা হলো–পূর্ব ডনবাস অঞ্চল পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া, নেটোতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে নিরপেক্ষ থাকা এবং পশ্চিমা সেনাদেরকে ইউক্রেইনের মাটিতে না রাখা। ক্রেমলিন-ঘনিষ্ঠ তিন রুশ সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর প্রকাশ করেছে।

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে ট্রাম্পের সঙ্গে তিন ঘণ্টার বৈঠকে মূলত ইউক্রেইন নিয়ে আলোচনা করেন পুতিন। তবে বৈঠকে কি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বা কোনও শর্ত ছিল কিনা- সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও কিছু তখন পুতিন বা ট্রাম্প কেউই প্রকাশ করেননি।

ট্রাম্প যে যুদ্ধটা থামাতে চান, তা আলাস্কায় কেবল পুতিনকে যেমন খাতির করেছে, হোয়াইট হাউসে জেলেনস্কিকেও তেমনটা করে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন। ইউরোপিয়ান নেতাদের প্রতিও তার মন্তব্য ও আচরণ অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি প্রেসিডেন্টসুলভ ছিল সেদিন। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প, জেলেনস্কি ও ভান্সের মাঝে যে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল সে ব্যাপারে সব পক্ষই এবার সচেতন ছিলেন, বলতে গেলে বেশিই ছিলেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট ভান্সের কটূ মন্তব্যের জন্য সেবারকার সভা বাকবিতণ্ডায় শেষ হওয়ায়, ট্রাম্প এবার ভান্সকে সামনে আসতে দেননি। তিনি না ছিলেন আলাস্কায়, না ওয়াশিংটনের এই সভায় জেলেনস্কির সঙ্গে হাত মিলানো ছাড়া অন্য কিছুতে। ট্রাম্প ও তার সাংবাদিকও এবার জেলেনস্কির স্যুটকোটের বেশ প্রশংসা করলেন।


আগের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে জেলেনস্কি এবার স্যুটকোট পরেছিলেন বটে, তবে টাই ছাড়া। তার কর্মকর্তারাও আগেই হোয়াইট হাউসকে বলে রেখেছিলেন, ভান্স যেন এর মধ্যে না থাকেন। তাদের সেই ইচ্ছাও পূরণ হয়েছে।

আগেরবার যে ধন্যবাদ না দেওয়ায় জেলেনস্কিকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল, এবার যেন সেটিই পুষিয়ে দিতে চাইছিলেন তিনি। মিনিটে মিনিটে ট্রাম্পকে থ্যাঙ্ক ইউ বলে গেছেন। ইউক্রেইনের রাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক ডেনিস পিলাস তো মিয়ারশাইমারের সঙ্গে একই অনুষ্ঠানে মজা করে বললেন, জেলেনস্কি ধন্যবাদ বলায় বিশ্বরেকর্ড করেছেন।


অন্যদিকে ভান্সও নীরব থেকে এক ধরনের রেকর্ড গড়েছেন বটে। সামাজিক মাধ্যমে কৌতুক করে বলা হচ্ছে, ভান্সের বৃহত্তম কূটনৈতিক বিজয় হলো, মুখ বন্ধ রাখা।

এতকিছুর পরও পরিস্থিতি মোটেও সহজ নয়। তবে সমীকরণটি স্পষ্ট: একদিকে ট্রাম্প ও পুতিন, অন্যদিকে জেলেনস্কি ও ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ। ট্রাম্প কাউকেই কিছু চাপিয়ে দিতে পারছেন না, কিন্তু যুদ্ধটা থামাতে চান।

এই সমীকরণে সবচেয়ে শক্তিমান অবস্থানে আছেন পুতিন, আর সবচেয়ে বাস্তববাদী ট্রাম্প—এ কথা স্বীকার করতেই হয়। কারণ তিনি স্পষ্ট বুঝছেন, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় ইউক্রেইন নেই। তিনি এ-ও জানেন যে রাশিয়াকে দমন করা আমেরিকার পক্ষেও সম্ভব নয়—যেমনটি সম্ভব হয়নি গত কয়েক দশকের যুদ্ধে।

অন্যদিকে ইউরোপীয় নেতারা চান ট্রাম্প আরও অবরোধ আরোপ করুন কিংবা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পুতিনকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করুন। কিন্তু ট্রাম্প চান ভিন্ন কিছু। তিনি চান, যুদ্ধবিরতি ছাড়াই পুতিন ও জেলেনস্কির মুখোমুখি আলোচনা আয়োজন করে সরাসরি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানো।

ট্রাম্পের কাঙ্ক্ষিত চুক্তি হলো এমন এক সমাধান, যা রাশিয়া ও ইউক্রেইনকে ফিরিয়ে নেবে ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারির পূর্বাবস্থায়। কিন্তু জেলেনস্কি চান আরও পেছনে ফিরে যেতে—একেবারে ২০১৪ সালের আগে, অর্থাৎ রাশিয়া কর্তৃক ক্রাইমিয়া দখলের আগে।

কিন্তু জেলেনস্কির সমর্থক ইউরোপিয়ান নেতারাও পুরোপুরি ট্রাম্প-নির্ভর ও সারাক্ষণ তাকে খুশি করতে ব্যস্ত। তাদের ওপর বিরাট বাণিজ্য শুল্ক আরোপের পর তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত গ্যাস কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে নিজেদের পক্ষে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। আবার এমন একটা ভাব করছেন যেন ইউক্রেইনকে তারাই রক্ষা করবেন, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ছাড়া তাদের কিছুই করার মুরোদ নেই।


ইউরোপ যে কেবল রাশিয়ার অধিপত্যের জন্য উদ্বিগ্ন তাই নয়, তারা ট্রাম্প ও পুতিনের সুসম্পর্ক নিয়েও বেশ চিন্তিত। ফলে রুশ-ইউক্রেইন যুদ্ধটা জিইয়ে রাখতে এখন তাদের আগ্রহটাই বেশি। বাইডেন আমল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রেরও সেই একই খায়েশ ছিল। কিন্তু এখনকার ট্রাম্প প্রশাসন বরং মনোযোগ অন্যদিকে দিতে চায়, চীনের ভবিষ্যৎ অধিপত্য মোকাবিলা তার কাছে ইউক্রেইনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


বর্তমান এই পরিস্থিতি বুঝতে আমরা ফিরে তাকাতে পারি খ্যাতিমান গ্রিক অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়ানিস ভারাওফ্যাকিসের একটি লেখায়। ২০২২-এর জুনে ‘প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে দ্য পিস প্রসেস ইউক্রেইন’স সাপোর্টারস শুড সাপোর্ট’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি লেখেন, “ইউক্রেইনের চূড়ান্ত বিজয়ের আহ্বান সবাইকে পরাজয়ের গহ্বরে ফেলবে–সম্ভবত কেবল অস্ত্র ব্যবসায়ী ও জীবাশ্ম জ্বালানিওয়ালা বাদে, যুদ্ধ যাদের জন্য সৌভাগ্য বহন করে এনেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে ইউক্রেইনিয়ান অর্থনীতির অলৌকিক সম্ভাবনা ক্রমশ শুকিয়ে যাবে।”


বলা বাহুল্য হচ্ছেও তাই। পক্ষান্তরে এই সাড়ে তিন বছরের যুদ্ধ ইউক্রেইনকে পর্যুদস্ত করে দিয়েছে। জেলেনস্কি স্বাভাবিকভাবে যুদ্ধ বন্ধ চান, তবে সম্মানজনকভাবে, কারণ আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও টিকতে হবে তার দলবলকে। ওই লেখায় ভারাওফ্যাকিস আরও বলেছেন, এই সম্ভাব্য শান্তি চুক্তিটি হবে এমন যেখানে প্রত্যেকে হবে অসন্তুষ্ট, তবে বিকল্প অন্য সবকিছুর তুলনায় তাই হবে মঙ্গলজনক।


পুতিন যুদ্ধ বন্ধে রাজি হবেন তিনটি কারণে, বলেছিলেন ভারাওফ্যাকিস। তার মতে সেগুলো হলো: রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্যমান অর্থনৈতিক অবরোধের সমাপ্তি, ২০১৪ সালে তার ক্রাইমিয়া দখল অলোচনার বাইরে ভবিষ্যতের বিষয় হিসেবে গচ্ছিত রাখা এবং ন্যাটোর হুমকি বন্ধ করে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কাছ থেকে ইউক্রেইনেরও প্রয়োজন একই নিরাপত্তা। এ গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি শেষ হয়েছে এভাবে: “অবশ্যই কোনো নিশ্চয়তা নেই যে একটি শান্তি চুক্তি কার্যকর হবে। যা নিশ্চিত তা হলো, চূড়ান্ত বিজয়ের ভ্রান্তিবিলাসে ডুবে থেকে চেষ্টা না করাটা হবে ক্ষমার অযোগ্য অন্যায়।”


২০২২-এর এপ্রিলে ইউক্রেইন ও রাশিয়ার মধ্যে একটি শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিলো যা নস্যাৎ করেছিল সেসময় ইউরোপ ও আমেরিকা উভয় দেশের নেতৃত্ব মিলে। সবাই তখন জেলেনস্কিকে অস্ত্র ও অর্থ সাহায্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয়ের লোভ দেখিয়ে উসকানি দিয়েছে। যার ফল হিসেবে ইউক্রেইন শক্তিশালী হয়নি, হয়েছে আরও দুর্বল। রাশিয়া দ্রুত বিজয়ের পরিবর্তে এক দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে ইউক্রেইনকে জড়িয়ে তাকে আরও ক্লান্ত, দুর্বল ও অসহায় করতে পারবে। ক্ষতি রাশিয়ারও হবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়তো তারা জিতবে। ইউরোপে কেবল রুশ বিদ্বেষ ও অহমিকার জয় হবে আর লাভ হবে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের।


এই বিদ্বেষ, অহমিকা ও নৃশংস অর্থলালসার বাধা অতিক্রম করে ট্রাম্প যদি ইউক্রেইনে শান্তি আনতে সফল হন, সেটি নিশ্চয়ই তার জন্য গৌরব করবার মত একটি বিজয় হবে। কিন্তু আসলেই কি পুতিন ও জেলেনস্কি মুখোমুখি বসবেন আর সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা, দুজনই উল্লেখযোগ্য ছাড় দিবেন শান্তির লক্ষ্যে? তবে এ উদ্যোগ ব্যর্থ হলে তা সবার জন্যই হবে ক্ষমার অযোগ্য অন্যায়।

 

ঋণ-বিডিনিউজ24.কম