এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেছেন, ২০১২ সালে নতুন ভ্যাট আইন করা হলো। সে আইন বাস্তবায়ন হলো ২০১৯ সালে। ৭ বছর ধরে এই আইন নিয়ে ঝগড়াবিবাদ করলাম। তারপরেও কিন্তু সেই ল্যাংড়া খোঁড়া আইন হয়েছে। যে ধরনের একটা পরিচ্ছন্ন আইন হওয়ার দরকার ছিল, সেটা করতে পারিনি। ব্যবসায়ীরা একমত হলে ভ্যাটের একক হারে যেতে চাই। তিনি আরও বলেন, ভ্যাট রিটার্ন সম্পূর্ণ অটোমেশনে চলে যাবে। ভ্যাটে আমরা কোনো পেপার রিটার্ন নেব না। সার্ভারে চাপ কমাতে ব্যবসাভেদে রিটার্ন দাখিলে শর্ত শিথিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে অডিট সিলেকশন বন্ধ করে দিয়েছি। এখন পর্যন্ত ভ্যাটের অডিট অটোমেটেড করতে পারি নাই। যতদিন পর্যন্ত অটোমেটেড সিলেকশন করতে না পারব ততদিন অডিট বন্ধ থাকবে, লাগলে কেয়ামত পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এনবিআর চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন। এ অনুষ্ঠানে সিপিডির একটি জরিপের ফল তুলে ধরা হয়। গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশের বিদ্যমান কর কাঠামো অন্যায্য, যা ব্যবসার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম। কর প্রশাসনে জবাবদিহির অভাব, দুর্নীতি আছে। ঘুস ছাড়া আয়কর রিটার্ন অ্যাসেসমেন্ট হয় না। প্রতি বছর কর ফাঁকিতে সরকার যে পরিমাণ অর্থ হারায়, সে অর্থ দিয়ে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ সাড়ে ৩, কৃষি খাতে ৬ ও স্বাস্থ্য খাতে ৬ গুণের বেশি বরাদ্দ দেওয়া যেত।
আবদুর রহমান খান বলেন, ব্যবসায়ীরা যেন কোনোভাবেই মনে না করেন, অহেতুক হয়রানির জন্য এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাই ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে অডিট সিলেকশন বন্ধ করে দিয়েছি। অগ্রিম আয়কর নিয়ে তিনি বলেন, আশির দশকে করপোরেট কর ছিল ৫০ শতাংশ। এর সঙ্গে মিল রেখে তখন এআইটিগুলো করা হয়েছিল। করপোরেট কর কমাতে কমাতে এখন ২০ শতাংশ হয়ে গেছে। তাই এআইটির সঙ্গে ম্যাচ করে না। এ বিষয়ে কাজ করার সময় এসেছে। একইভাবে ব্যক্তিশ্রেণির কর হারের সর্বোচ্চ সীমা ছিল ৬০ শতাংশ। সেটিকেও কমাতে কমাতে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে।
এনবিআর দুই ভাগ নিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, কর ফাঁকি, কর প্রশাসনে অদক্ষতা আছেÑএটা অস্বীকারের উপায় নেই। এসব সমস্যার সমাধান আমাদের একার পক্ষে করা সম্ভব না। একটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কর প্রশাসন গড়ে তুলতে এনবিআর পৃথক করা হয়েছে। ন্যূনতম করকে ‘কালাকানুন’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, নিঃসন্দেহে এটা একটা কালাকানুন। কারণ এটা আয়করের মূল নীতির পরিপন্থি। মুশকিলটা হলো এগুলো ঠিক করতে গেলে রাজস্ব আদায় আরও কমে যায়। যখন কর অফিস ও করদাতারা মোটামুটি শৃঙ্খলার মধ্যে আসতে পারবে, তখন এগুলো উঠিয়ে নেওয়া হবে।
মূল প্রবন্ধে জরিপের তথ্য তুলে ধরে সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী তামিম আহমেদ বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামে ১২৩টি করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও সারা দেশের ৩৮৯টি ব্যবসা ফার্মের ওপর জরিপ চালানো হয়। জরিপে ৮২ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বলেছে বর্তমান করের হার অন্যায্য, এটি তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে একটি। এছাড়াও কর কর্মকর্তাদের মধ্যে জবাবদিহির অভাব, ব্যাপক দুর্নীতি এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল কর জমা দেওয়ার ব্যবস্থার অনুপস্থিতিকে যথাক্রমে ৭৯ শতাংশ, ৭২ শতাংশ এবং ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা প্রধান উদ্বেগ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। ৬৫ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রদেয় করের পরিমাণ গণনা নিয়ে কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিরোধের কথা জানিয়েছে। গড়ে বাংলাদেশে একটি কোম্পানিকে কর রিটার্ন-সম্পর্কিত উপকরণ প্রস্তুত করতে এবং জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তার মোট প্রদত্ত করের ৫ দশমিক ২৭ শতাংশ ব্যয় করতে হয়। জরিপে ৪০ শতাংশ কোম্পানি কর ফেরত সমন্বয় করার সময় সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, যা এনবিআরের অদক্ষতা এবং রিফান্ড প্রক্রিয়ায় বিলম্বের ইঙ্গিত দেয়। ৪৫ শতাংশ কোম্পানি জানিয়েছে যে, কর কর্মকর্তারা তাদের কাছ থেকে ঘুস চেয়েছিলেন, যা কর প্রশাসনের মধ্যে স্বচ্ছতার অভাব এবং দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়।
অনুষ্ঠানে সাবেক অর্থসচিব সিদ্দিকুর রহমান, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ, সাবেক সদস্য ফরিদউদ্দিন আহমেদ, ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ এইচ মাহবুব সালেকিন, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট জাহিদ হাসান এনবিআরের প্রথম সচিব মশিউর রহমান, ক্রিস্টিয়ান এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর নুজহাত জাবিন বক্তব্য রাখেন।