ভারত ও মার্কিন ট্যারিফ যুদ্ধের ফল ভারতের পক্ষেও যেতে পারে, মোদীর অনড় অবস্থান থেকে তার ইঙ্গিত মেলে।
মার্কিন-ভারত ট্যারিফ যুদ্ধের একটা বড় রণক্ষেত্র ভারতের দুগ্ধ শিল্প, এটা সকলেই জানেন। যেটা খেয়াল রাখা দরকার, ভারতের রফতানি কেন্দ্রিক শিল্প মালিকরা যথাসম্ভব চাপ তৈরি করছেন মোদীর ওপর, ট্যারিফ নিয়ে। কিন্তু মোদী অনড় রয়েছেন। কারণ ভোটের হিসাব।
দুগ্ধ শিল্পে ভারত যদি ছাড় দেয়, ভারতের দুগ্ধ শিল্পের ক্ষুদ্র কৃষকরা রাতারাতি ধ্বংসের শিকার হবেন। ভারতে প্রায় আট কোটি কৃষক গরুর দুধ উৎপাদন করেন, অন্যান্য পর্যায়েও বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হয়। ভারতে বিজেপির ঘাঁটিও এদের কোন কোন রাজ্য: রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র, পাঞ্জাব।
এই যে ভারতে রফতানি কেন্দ্রিক শিল্পের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ভারতের কোটি কোটি কৃষক, এবং ভারত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কৃষকদের পক্ষে— এটা সম্ভব হচ্ছে সেখানে ভোটের রাজনীতি আছে বলে। বেশ কিছুদিন ধরেই ভারতীয় গণমাধ্যমে দেখছি মোদীর সমালোচনা বিরোধীদল করছে ট্যারিফ যুদ্ধে তার বেকায়দা অবস্থার জন্য, কিন্তু এরা কেউই কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার বিরোধিতা করছেন না।
কারণ, শ্রেণিগতভাবে এরা সকলেই শিল্পপতিদের জন্য উদ্বিগ্ন হলেও কৃষকদের ভোট দেয়ার ক্ষমতা এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক অসন্তোষকে ভয় পান সকলেই।
আরেকটা বিষয় হলো, ভারতের দুধ উৎপাদনকারী কৃষকের সংখ্যা কিন্তু খুব ধীরে হলেও কমছে, যদিও খামারী ও শ্রমিকের সংখ্যা এখনও অনায়াসে যে কোন সরকারকে ফেলে দিতে সক্ষম অনেকগুলো রাজ্যে। বছর বিশেক আগেকার একটা পরিসংখ্যানে দেখেছিলাম দুধের সাথে জড়িত কৃষকের সংখ্যা প্রায় দশ কোটি, কিংবা তার চাইতে বেশি। আজকে দেখলাম গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে বলছে আট কোটি, একটাতে বলছে ৬ কোটি। জনসংখ্যা বেড়েছে, গরুর সংখ্যাও বেড়েছে, দুধ উৎপাদনও। কিন্তু গরু উৎপাদন করা কৃষকের সংখ্যা খানিকটা কমেছে।
সম্ভবত কিছুটা মাত্রায় যান্ত্রিক নির্ভরতা এর জন্য দায়ী। নতুন প্রজন্মের এবং শিক্ষিত কৃষক সন্তানরা গরু পালায় পিতাদের চাইতে কম আগ্রহী, তারা চাকরি বা অন্য ব্যবসায় খোঁজেন বেশি। ফলে ঘাস লাগানো কিংবা প্রক্রিয়াজাত করানোর নানান পর্যায়ে আধাস্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির সংযোগ ঘটেছে ভারতের দুগ্ধ শিল্পে।
ভারতের চাইতে মার্কিন দুগ্ধ শিল্পের উৎপাদনশীলতা গরু প্রতি প্রায় ৭ গুন বেশি। যান্ত্রিক নির্ভরতার কারণে মোট কর্মংস্থানও অনেক কম। ফলে অনেক কম মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে এই শিল্পে জড়িত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এর আর্থিক মূল্যমান বেশি।
অধিকাংশের স্বার্থকে যদি জাতীয স্বার্থ ধরি, এবং ক্ষুদ্র কিছু অংশের স্বার্থকে ধরি কোটারি, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বন্দোবস্ত কিভাবে জাতীয় স্বার্থকে ধরে রাখতে পারে, আপাতদৃষ্টে খুবই খারাপ কাউকেও বাধ্য করতে পারে জাতীয় স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নিতে, এটা তার একটা ভালো দৃষ্টান্ত হতে পারে।
ভারতের সামনে দুটো রাস্তা খোলা। একটা হলো চাপের কাছে নতি স্বীকার করে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম, কিন্তু সস্তার দিক দিয়ে নিকটতম দুগ্ধশিল্পের উৎপাদক মার্কিন উৎপাদকদের জন্য বাজার খুলে দেয়া।
এই যে ভারত তার কৃষিখাতের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশকে বাজারের চাপের সামনে ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি (প্রধানত ভোটের বিবেচনা থেকে জন্ম নেয়া জাতীয় স্বার্থর বিবেচনায়), রফতানি কেন্দ্রিক শিল্পখাতকে রীতিমত সংশয়ে ফেলে দিয়ে, এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত। মোদী তিনটা কারণে এই ঝুঁকি নিয়েছেন।
১. তিনি জানেন ট্যারিফের আলোচনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় না। আজকে হোক কালকে হকো, এই ট্যারিফ আমেরিকাকে সরাতে হবে।
২. রফতানি কেন্দ্রিক শিল্পের ক্ষয়ক্ষতি হয়তো পুরোটা এড়ানো যাবে না, কিন্তু ক্ষতি খানিকটা সামাল দেয়া যাবে। দীর্ঘ ও মধ্য মেয়াদে রফাতানির বৈচিত্র আরও বৃদ্ধি এবং নির্ভরতা কমাবার চাপ তৈরি হবে দেশে।
৩. কিন্তু এত বড় আকারে কৃষক অসন্তোষ দেখা দিলে কিছুই টিকবে না।
মোদী যদি অন্য বিকল্পটি নিতেন রফতানি ধরে রাখার স্বার্থে, পশ্চিম ভারতের এই দুর্বলতাকে ব্যাবহার করতো বারবার। ওদিকে মোদি পরের ভোটেই নিজেও হরতেন।
এই পুরো বিষয়টা থেকে বাংলাদেশের কি শেখার আছে?
বাংলাদেশের পুরো গরু কেন্দ্রিক শিল্প এখন দাঁড়িয়ে আছে ভারতের একটা শত্রুতামূলক আচরণ থেকে। আমরা অনেকেই খেয়াল করি না কোরবানির গরুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে বিপুল পরিমান মানুষের আংশিক কর্মসংস্থান হচ্ছে। এটাতে বিপুল অগ্রগতি হয়েছে ভারত বাংলাদেশে গরু পাঠানো বন্ধ করার পর, আবারও, এটা ভারতের ভোটের রাজনীতিকে ধর্মীয়করণ করার প্রভাবে।
এটা বলা যায়, বাংলাদেশের জন্য শাপে বর হয়েছে।
ট্যারিফের ভয় দেখিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের একটা গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল ইজারা দেয়ার বন্দোবস্তও চূড়ান্ত করা হয়েছে। আরও বহু বিষয়ে মার্কিনীদের খুশি রাখার নীতি নিয়েছে অন্তবর্তী সরকার। কিন্তু দীর্ঘ বা মধ্য মেয়াদে গার্মেন্ট নামের এই একক পণ্য রফতানি নির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসার কোন উদ্যোগ, কোন ভাবনা সরকারের আসলে নেই।
অন্য কোন প্রযুক্তিখাতে বিনিয়োগ ও নীতিমালা এবং সক্ষমতা তৈরির কোন চেষ্টাও দেখি না। সম্প্রতি বিশ্বব্যাঙ্কের একটা ঋণ খুবই আলোচিত হচ্ছে, যেখানে আমাদের রীতিমত যোগ্য সফটওয়ার খাত থাকার পরও দেশের কর্মসংস্থান ও উদ্যোগক্তা সম্ভাবনা নষ্ট করে বিদেশী প্রতিষ্ঠান থেকে অনেকগুলো সফটওয়ার ক্রয়ের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের একজন সফল ও পুরনো সফটওয়ার উদ্যোক্তা ব্যক্তিগত আলাপে বললেন, এই ঋণ আমাদের সফটওয়ার খাতকে বহুবছর পিছিয়ে দেবে।
এমনকি কৃষির কথাও যদি বিবেচনা করেন, পৃথিবী জুড়ে এখন নিরাপদ খাবারের চাহিদা বাড়ছে। অথচ, গার্মেন্ট শিল্প আমাদের পানি জমিকে বিষাক্ত করছে, নদী মাছ শূন্য হচ্ছে, আর পৃথিবীর উর্বরতম ভূমির একটা বড় অংশ চাষের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে।
পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ পোষাক শিল্পকে—মানে দর্জি বা সেলাই শিল্পকে একটা আপতকালীন উত্তরনের শিল্প হিসেবে দেখে। আমাদের সরকারগুলো দেশকে চিরস্থায়ীভাবে এই পর্যায়ে রাখার পরিকল্পনাই করে যাচ্ছে।
বিদেশী চাপর এই সব বিষয়ে এমমনকি চীনের নীতি অনেক বেশি দৃঢ়, সব সময়েই।
তারা ব্যবসার কোন সুযোগ মার্কিন বলি, ভারত বলি, ছাড়ে না। কিন্তু সব সময়েই তাদের জাতীয স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।
বাংলাদেশে হাসিনার সরকারের কথা ভাবেন, তারা ভারতকে কেন্দ্রে রেখে পৃথিবীর যে কোন শক্তিশালী দেশ যা কিছু আবদার করেছে, সবই পূরণ করেছে। সব সময়ে। এই আবদার কারী মার্কিন, চীন, ইইউ—যেই হোক।
যে রাষ্ট্রের সরকার নিজের দেশের জনগণের ওপর ভরসা করতে পারে না, তাকে সব সময়ে বিদেশীরদের মাঝে ভারসাম্য করে, তাদের ওপর নির্ভর করে চলতে হয়। বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের এইখানে মিল।
অন্যদিকে ভারতের সাতে চীনের মিলের জায়গাটা হলো তারা অনেকখানি নিজের জাতীয় স্বার্থের ওপর ভরসা করতে পারে।
ভারতের সাথে চীনের অমিলের জায়গাটাও আছে।
চীন গুরুত্ব দিয়েছে তৃণমূলের উন্নয়নকে ভিত্তি ধরে। ফলে ওইখানে রুপান্তরের সময়ে গুরুত্ব পেয়েছেন খালি পায়ের চিকিৎসকরা, যারা চীনের স্বাস্থ্যসেবা বদলে দিয়েছেন। স্থানীয় পর্যায়ের কারিগর ও প্রযুক্তিবিদরা গুরুত্ব পেয়েছেন, যারা তাদের শিল্প বদলে দিয়েছে। তাই বলে তারা সেরা চিকিৎসাবিদ্যা ও প্রযুক্তিবিদ্যাকে অবহেলা করেনি। কিন্তু মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রেখেছে। এই পর্ব শেষ করার পর চীন একটা রুপান্তর করছে, তারা এখনই অনেকটা, ভবিষ্যতে অবশ্যই— দুনিয়ার প্রকৌশল বিদ্যার কেন্দ্রে পরিণত হবে। মানে ও সংখ্যায় শ্রেষ্ঠ।
ভারতের নেহেরু বিষয়ে রামচন্দ্র গুহ যেটা বলেছেন, নেহেরু প্রাথমিক শিক্ষার চাইতে গুরুত্ব বেশি দিতেন আইআইটি এবং ইত্যাদি ধরনের বড় বড় প্রতিষ্ঠান নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থাকে। ফলে, বড় বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, তাদের মান বিশ্বমানের। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই তারা দেশের রুপান্তরে ব্যর্থ হয়েছে।
এর সাথে যুক্ত করে ভাবা যাক কৃষকের কথাও। কৃষকের স্বার্থকে একটা ধরনে প্রাধান্য দিলেও কৃষির জাতীয় রুপান্তরে, বড় মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় নেহেরুর আগ্রহ ছিল না।
এই কারণেই কৃষকের ভোটের অধিকার নিয়ে স্বাধীনতার পর নেহেরুর যুগান্তকারী অবস্থানের পরও ভারত দ্রুতই চীনের তুলনায় পিছিয়ে পরতে থাকে, সামগ্রিক বিকাশে। সেটার প্রথম ফল তারা হাতেহাতে পায় ১৯৬২র যুদ্ধে।
পাকিস্তানের সাথে সর্বশেষ যুদ্ধেও ভারত আসলে চীনের হেকমতই টের পেয়েছে।
এইটা আসলে সেই জাতীয় একটা বিপ্লবের স্পর্শগুণ: সমাজকে, রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে রুপান্তরিত করে তার সম্ভাবনাকে বাস্তবে রুপ দেয়।
অন্যদিকে এই বিপ্লবটা না ঘটলে একটা দেশের নেতারা মানসিক দিক দিয়ে খর্বাকৃতির হতে থাকেন, নিজেদের অক্ষমতা তারা জনতার ওপর চাপান: আমরা পারি না, আমরা পারবো না, ওদের কথা আমাদের শুনতে হবে... জাতীয় আত্মবিশ্বাসও এইভাবে নাই হতে থাকে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং রাজনীতিক
নোট: লেখাটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক থেকে নেয়া।