logo
ads

এক নীরব বটবৃক্ষের ছায়ার হারিয়ে যাওয়া

হাবীব ইমন 

প্রকাশকাল: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০৯ পি.এম
এক নীরব বটবৃক্ষের ছায়ার হারিয়ে যাওয়া

সংগৃহীত

বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ইতিহাসে কিছু মানুষ এমনভাবে খচিত থাকে, যাদের নাম কেবল সময়ের মধ্যেই নয়, এই দেশের নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে চিরকাল জড়িয়ে থাকে। কমরেড বদরুদ্দীন উমর ছিলেন সেই ব্যক্তিত্বের এক অমোঘ প্রতীক। যতীন সরকার স্যারের পর, এবার উমরও আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তাদের চলে যাওয়া শুধুই শোকের বিষয় নয়, এটি আমাদের জন্য এক গভীর নৈতিক এবং রাজনৈতিক শূন্যতার সংকেতও বহন করছে। কারণ এই দেশ, এই রাজনৈতিক ঐতিহ্য, এমন কিছু মানুষের ওপর দাঁড়িয়ে আছে যারা একাত্মভাবে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে জানতেন।

বদরুদ্দীন উমর ছিলেন সেই বটবৃক্ষ, যার ছায়ায় আমরা আশ্রয় চাইতাম। অন্ধকারে বাতিঘরের মতো, তিনি পথ দেখাতেন, নির্দেশ দিতেন, প্রেরণা দিতেন। কিন্তু তিনি কখনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বা ক্ষমতার খোঁজে চলেননি। মেধা বিক্রি করেননি, নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে আপস করেননি। একাই দাঁড়িয়ে থেকেছেন, স্বীয় শক্তি ও অটল ন্যায়ের ওপর নির্ভর করে। তিনি এককী দলে থেকে শ্রমিক ও কৃষকের পক্ষে কথা বলেছেন, নির্মোহভাবে লড়েছেন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে।

বদরুদ্দীন উমরের রাজনৈতিক জীবন কেবল ব্যক্তিগত সংগ্রামের ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের বামপন্থী আন্দোলনেরও জীবন্ত রূপক। তিনি প্রমাণ করেছেন যে রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি মানুষের জীবন, শ্রম, ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধতা। তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি সব সময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, ইতিহাসের জটিল মোড়েও তাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

বদরুদ্দীন উমর প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অগ্রাহ্য করার মধ্যে দিয়ে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন। এদেশে মেধা ও মগজ বিক্রি না করে, স্বীয় শক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে দাঁড়ানোর সাহস তিনি দেখিয়েছেন। তার এই অবস্থান দেখিয়েছে, কীভাবে আদর্শ, ন্যায় এবং নিষ্ঠা একত্রিত হয়ে সমাজকে একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায্য পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

১৯৭০-এর দশক থেকে শুরু করে ২০০০-এর পরবর্তী সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন, লেবার ইউনিয়নগুলোর গঠিত কাঠামো, এবং স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলোতে উমরের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ছিলেন একজন তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক, যিনি শ্রমিকদের দৈনন্দিন যন্ত্রণা, কৃষকের আর্তনাদ এবং সাধারণ মানুষের অসাম্যকে কেবল দেখতেন না, বরং তা প্রতিরোধ ও পরিবর্তনের প্রয়াসে যুক্ত করতেন। 

রাজনৈতিক কৌশল বা তত্ত্বের ক্ষেত্রে তার সঙ্গে দ্বিমত থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তার ন্যায়ের প্রতি অটল বিশ্বাস, সংগ্রামী মনোবল এবং মানবিকতা বাংলাদেশের বাম রাজনীতিকে একটি অনন্য গৌরব দিয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক আদর্শ ও নৈতিক দায়িত্ব একত্রে থাকলেই শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের জন্য প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তি তৈরি করা যায়।

বদরুদ্দীন উমর কখনো নিজের সুনামের জন্য লড়েননি। তার জন্য রাজনীতি ছিল একপ্রকার সামাজিক দায়বদ্ধতা—যা শুধু ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার নয়, বরং নিপীড়িত জনগণকে স্বাধীনতা ও মর্যাদার পথে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব। এমন অবস্থান একমাত্র সৎ, অটল ও মানবিক নীতির মানুষেরাই নিতে পারেন।

এবার ঝড় এসেছে। আমাদের আশ্রয় নেওয়ার বটবৃক্ষগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। বাতিঘরের বাতি নিভে যাচ্ছে। প্রশ্ন আসে, আমরা কোথায় আশ্রয় নেব? আমাদের চিন্তার তরী কোথায় ভিড়াবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হলে আমাদের সেই নৈতিক ও রাজনৈতিক মানদণ্ডকে ধরে রাখতে হবে, যা বদরুদ্দীন উমর নিজে বিশ্বাস করেছিলেন।

শতাব্দীজুড়ে এই ভূখণ্ডের নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে তার নাম অবিচ্ছেদ্য। তার জীবন, আদর্শ এবং অবিচল ন্যায়ের প্রতি প্রতিশ্রুতি আমাদের জন্য স্থায়ী আলো হয়ে থাকবে, যা শুধু শোককে অতিক্রম করবে না, বরং আগামী প্রজন্মকে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা দেবে। আমরা তার দেখানো পথ ধরে চলতে বাধ্য।

ষাটের দশকে বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন আর ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে তার লেখা বইগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সাহসে, সততায়, ত্যাগে, পাণ্ডিত্যে তিনি ছিলেন অনন্য। তার চিন্তা বুঝতে সহায়ক বিশেষ করে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৬৬), ‘সংস্কৃতির সংকট’ (১৯৬৭), ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৬৯)—তিনটি বই। এই বই লিখেই তিনি ক্ষান্ত হননি। তিনি শাসকদের অধীনে চাকরি পর্যন্ত করবেন না, এ মনোভাব পোষণ করে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন।

বদরুদ্দীন উমর আমাদের শিখিয়েছেন, আদর্শের সঙ্গে আপস করা যায় না, ন্যায় ও মানবিকতার সঙ্গে আপস করা যায় না। তিনি দেখিয়েছেন, যে কোনো রাজনৈতিক সময়, যে কোনো ঝড়—চাই সে অর্থনৈতিক বৈষম্য হোক বা সামাজিক অন্যায়—সত্যিকারের নেতা সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ায়।

লাল সালাম, প্রিয় কমরেড। চির বিদায়। ইতিহাস আপনাকে কখনো ভুলবে না। আপনার আদর্শ, ন্যায়ের প্রতি অটলতা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ় মনোভাব আমাদের জন্য চিরস্থায়ী।
 

লেখক : হাবীব ইমন
কবি, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এই বিভাগের আরও খবর

dainikamarbangla

সর্বশেষ খবর

হাইলাইটস

বিশেষ সংবাদ