২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলার আসাদপুর গ্রামে একটি উল্লেখযোগ্য সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ধর্মীয় কটূক্তির অভিযোগে বিক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতা মাইকে ঘোষণা দিয়ে চারটি মাজারে হামলা, ভাঙচুর এবং আগুন দেয়।
এই ঘটনা বাংলাদেশে ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক অস্থিরতার পরবর্তী সময়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার একটি অংশ হিসেবে দেখা যায়। নিচে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা, কারণ, পরিণতি এবং ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া অনুরূপ ঘটনাগুলোর একটি সমন্বিত বিশ্লেষণ দেওয়া হলো। তথ্যগুলো সমকাল, প্রথম আলো, Al Jazeera, UN OHCHR রিপোর্ট এবং Bangladesh Hindu Buddhist Christian Unity Council-এর মতো নির্ভরযোগ্য সোর্স থেকে সংগৃহীত, যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ।
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, বৃহস্পতিবার, সকাল সাড়ে নয়টার দিকে কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলার আসাদপুর ইউনিয়নের আসাদপুর গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। এটি কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত একটি গ্রামীণ এলাকা। ঘটনার মূল কারণ ছিল ফেসবুকে ধর্মীয় কটূক্তির অভিযোগ। ১৭ সেপ্টেম্বর (বুধবার) সকাল ১০:৫২ মিনিটে ‘বেমজা মহসিন’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে এক যুবক ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দেন। এই পোস্ট স্থানীয় জনতার মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে, এবং তারা হোমনা থানার সামনে জড়ো হয়ে অভিযুক্ত যুবকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেন। পুলিশ ও সেনাবাহিনী পরিস্থিতি শান্ত করে, এবং ওই দিন দুপুরে যুবকটিকে গ্রেপ্তার করা হয়। সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ইসলামী যুবসেনা হোমনা উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শরীফুল ইসলাম বাদী হয়ে যুবকটির বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। ১৮ সেপ্টেম্বর সকালে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়।
কিন্তু গ্রেপ্তার সত্ত্বেও, বৃহস্পতিবার সকালে বিক্ষুব্ধ জনতা মাইকে ঘোষণা দিয়ে আসাদপুর গ্রামের চারটি মাজার—কফিল উদ্দিন শাহ, হাওয়ালি শাহ, কালাই শাহ এবং আবদু শাহ—এ হামলা চালায়। তারা মাজারগুলোতে ভাঙচুর করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়, বিশেষ করে আসাদপুরের একটি মাজারে আগুন লাগানো হয়, যার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে মাজারগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কুমিল্লা পুলিশ সুপার মো. নাজির আহমেদ খান এবং হোমনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ক্ষ্যেমালিকা চাকমা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুলিশ সুপার জানান, অভিযুক্ত যুবককে তৎক্ষণাৎ গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তবে হামলাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। হোমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম এবং ইসলামী ফ্রন্টের সেক্রেটারি সফিক রানা জানান, যুবকটি দীর্ঘদিন ধরে উসকানিমূলক পোস্ট দিয়ে আসছিল, এবং তারা তার ফাঁসির দাবি জানাচ্ছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং দেশত্যাগের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। এই সময়টি "জুলাই রেভোলিউশন" নামে পরিচিত, যা কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উদ্ভূত হয়ে সরকারবিরোধী প্রতিবাদে রূপ নেয়। ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত এই আন্দোলনে অন্তত ২৩০ জন নিহত হয়, যার মধ্যে ১২-১৩% শিশু। হাসিনার পতনের পর আওয়ামী লীগের সমর্থক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় (হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আহমদিয়া) এবং সুফি মাজারের উপর প্রতিশোধমূলক হামলা বৃদ্ধি পায়। সামাজিক মিডিয়ায় কটূক্তি বা রাজনৈতিক উসকানি এই হামলার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত। নিচে ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রধান ঘটনাগুলো অনুচ্ছেদ আকারে বর্ণনা করা হলো, যা পূর্বে ছকে উল্লেখিত ছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের ৫২টি জেলায় (ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা সহ) ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের উপর প্রতিশোধমূলক হামলার পাশাপাশি হিন্দু মন্দির, বাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। Bangladesh Hindu Buddhist Christian Unity Council-এর মতে, এই সময়ে ২০৫টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়, যার মধ্যে ৪৫ জন হিন্দু নিহত এবং ১০০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়। মোট সহিংসতায় ২৩০ জন নিহত হয়। এই হামলাগুলো প্রায়শই আওয়ামী লীগের সাথে হিন্দু সম্প্রদায়ের কথিত সম্পর্কের কারণে লক্ষ্যবস্তুবিদ্ধ ছিল।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট, নারায়ণগঞ্জ এবং শরীয়তপুরে মাজারে হামলার ঘটনা ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, পীর গোলাম মহিনউদ্দিনের আস্তানা এবং ফকির করিম শাহ মাজারে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। এই সময়ে ১২টি মাজারে হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়, যাতে একজন নিহত এবং ৪৩ জন আহত হয়। এই হামলাগুলো স্থানীয় ইসলামী গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা সুফি মাজারকে ‘বিদআত’ (ধর্মবিরোধী) হিসেবে গণ্য করার কারণে সংঘটিত হয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সারা দেশে ৪০টি মাজার এবং দরগায় ৪৪টি হামলার ঘটনা ঘটে। এই হামলাগুলো সুফি সমাধি এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্পত্তির উপর লক্ষ্যবস্তুবিদ্ধ ছিল। এতে ভাঙচুরের পাশাপাশি ভক্তদের উপর হামলা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাগুলো সামাজিক মিডিয়ায় কটূক্তি বা রাজনৈতিক উসকানির সাথে যুক্ত ছিল।
২০২৫ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত পাবনা, জগন্নাথপুর এবং কুষ্টিয়ায় জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি-র মধ্যে সংঘর্ষের কারণে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। এই সময়ে ধর্মীয় মেলা বন্ধ করা হয় এবং মাজার ও মন্দিরে হামলা হয়। এতে ২৫ জনের বেশি আহত হয়, যার মধ্যে পাঁচজন গুরুতর। এই হামলাগুলো প্রায়শই রাজনৈতিক প্রতিশোধ এবং স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সাথে সম্পর্কিত ছিল।
২০২৫ সালের জুন থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে, বিশেষ করে কুমিল্লায়, ২৫৮টি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে। এই হামলাগুলো হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উপর লক্ষ্যবস্তুবিদ্ধ ছিল, যার মধ্যে মাজার এবং মন্দিরে আক্রমণ অন্তর্ভুক্ত। মোট ১৭৬৯টি হামলার মধ্যে ১২৩৪টি রাজনৈতিক এবং ২০টি সাম্প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই ঘটনাগুলোতে কোনো বড় হত্যাকাণ্ডের খবর না থাকলেও সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি হয়।
কুমিল্লার হোমনা ঘটনা (১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫) এই ধারারই অংশ। এই ঘটনায় কোনো মৃত্যু না হলেও ভাঙচুর এবং আগুনের কারণে মাজারগুলোর ক্ষতি হয়। পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে (অনুরূপ ঘটনার সাথে সম্পর্কিত), এবং তদন্ত চলছে।
কুমিল্লার এই ঘটনা স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা বাড়িয়েছে, যদিও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫৬০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। UN OHCHR-এর ফেব্রুয়ারি ২০২৫ রিপোর্ট অনুসারে, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর লক্ষ্যবস্তুবিদ্ধ হামলা এবং জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা (যেমন মহিলাদের উপর ধর্ষণের হুমকি) বৃদ্ধি পেয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়কে আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত বলে হামলার শিকার হতে হয়েছে, যদিও বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তাদের দ্বারা হামলা প্রতিহত করার নজিরও রয়েছে। Bangladesh Hindu Buddhist Christian Unity Council-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ২৪৪২টি সংখ্যালঘু-সম্পর্কিত হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে মন্দির, মাজার এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি লক্ষ্যবস্তু ছিল। এই হামলাগুলোর পেছনে রাজনৈতিক প্রতিশোধ, সামাজিক মিডিয়ায় ফেক নিউজ বা কটূক্তি এবং ঐতিহাসিক উত্তেজনা (যেমন ২০২১ সালে দুর্গাপূজায় হামলা) প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত। ইসলামী গোষ্ঠীগুলো, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী, সুফি মাজারকে ‘বিদআত’ হিসেবে গণ্য করে এই ধরনের হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার, মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে, এই হামলাগুলোর তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে সমালোচকরা সরকারের ব্যর্থতা এবং অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলেছেন। জাতিসংঘ এবং Amnesty International বাংলাদেশ সরকারকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশে হিন্দু (৮%), বৌদ্ধ (১%), খ্রিস্টান (০.৩%) এবং আহমদিয়া সম্প্রদায় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই ধরনের সহিংসতা বন্ধ করতে শান্তি, আইনের শাসন এবং সামাজিক মিডিয়ায় কটূক্তি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।


