দক্ষিণ এশিয়া আবারও প্রমাণ করেছে, গণআন্দোলনের সামনে কোনো ক্ষমতাই স্থায়ী নয়। দুর্নীতি, কুশাসন, স্বৈরাচারী দমননীতি কিংবা অর্থনৈতিক বিপর্যয়—এই সবকিছুর মিলিত অভিঘাতে একের পর এক প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য হতে হয়েছে। তাদের কেউ ছিলেন প্রাসাদোপম বাসভবনের অধিবাসী, কেউ অভ্যস্ত ছিলেন বিলাসবহুল গাড়িবহর ও ভিআইপি প্রটোকলে; অথচ আজ অনেকেই রাজনৈতিকভাবে নির্বাসিত, আবার কেউ জনরোষে কোণঠাসা।
শেখ হাসিনা – বাংলাদেশ
আন্দোলনের পটভূমি: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন হঠাৎ দমন-পীড়নে রক্তাক্ত রূপ নেয়। পুলিশের গুলি, ব্যাপক গ্রেফতার ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সেনা মোতায়েন আন্দোলনকে আরও তীব্র করে। রাজধানী ঢাকায় লাখো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।
শেষ দিন: ৫ আগস্ট ঢাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ ও সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে শেখ হাসিনা হঠাৎ গণভবন ত্যাগ করেন। পরে পদত্যাগের ঘোষণা আসে।
বিলাসী জীবন: দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে গণভবনে ভিআইপি জীবন কাটিয়েছেন। বিদেশ সফরে বিলাসবহুল হোটেল, সর্বত্র প্রটোকল, এবং নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকতেন।
বর্তমান করুণ পরিণতি: এখন আর গণভবনে প্রবেশাধিকার নেই। লন্ডন ও দিল্লির মধ্যে অবস্থান করছেন বলে শোনা যায়। বাংলাদেশে তার রাজনৈতিক দল অচলাবস্থায়। একসময় যিনি ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্র, এখন তিনি নির্বাসিত ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
কেপি শর্মা ওলি – নেপাল
আন্দোলনের পটভূমি: ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে “জেন-জি আন্দোলন” দুর্নীতি, বেকারত্ব ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে। সরকারের কঠোর দমনপীড়নে কাঠমান্ডুতে ১৯ তরুণ নিহত হয়।
শেষ দিন: সানেপায় শাসকদলের কার্যালয় ও তার ব্যক্তিগত বাসভবনে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। পুলিশ নিয়ন্ত্রণ হারায়। আন্তর্জাতিক চাপ ও দেশজুড়ে অবরোধের মুখে ওলি পদত্যাগ ঘোষণা করেন।
বিলাসী জীবন: প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও ব্যক্তিগত বাসভবনে উচ্চ নিরাপত্তা, বিলাসবহুল গাড়িবহর, বিদেশে চিকিৎসা ও কেনাকাটা—সবই ছিল তার নিয়মিত জীবনযাপন।
বর্তমান করুণ পরিণতি: এখন কাঠমান্ডুতে আছেন, তবে প্রভাবহীন। বাড়ি ঘেরা নিরাপত্তাহীনতায়; মন্ত্রীদের অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। ওলির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কার্যত শেষ হয়ে গেছে।
মহিন্দা রাজাপাক্ষে – শ্রীলঙ্কা
আন্দোলনের পটভূমি: ২০২২ সালে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে খাদ্য ও জ্বালানি ঘাটতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। হাজার হাজার মানুষ কলম্বোর রাস্তায় নামে।
শেষ দিন: বিক্ষোভকারীরা তার সরকারি বাসভবন ঘিরে ফেলে। জীবন বাঁচাতে হেলিকপ্টারে পালাতে হয় রাজাপাক্ষেকে। পদত্যাগপত্র পাঠানো হয় পরদিন।
বিলাসী জীবন: প্রাসাদোপম বাসভবন, বিলাসবহুল গাড়িবহর, পরিবারকেন্দ্রিক শাসন, রাষ্ট্রীয় অর্থে বিদেশ ভ্রমণ—সব মিলিয়ে রাজাপাক্ষে ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বিতর্কিত বিলাসী নেতা।
বর্তমান করুণ পরিণতি: তিনি শ্রীলঙ্কাতেই আছেন কিন্তু জনরোষ এড়াতে গোপনে বসবাস করছেন। রাজনৈতিক প্রভাব হারিয়েছেন, পরিবারও দুর্বল।
অপরদিকের ঘটনা এশিয়ার আরেক দেশ: মঙ্গোলিয়া
আন্দোলনের পটভূমি: ২০২৫ সালের জুনে উলানবাটরে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তরুণরা সংসদ ভবন ঘেরাও করে।
শেষ দিন: ওয়ুন-এর্দেনে সংসদে অনাস্থা ভোটে হেরে যান। রাজপথ উত্তাল হলেও তিনি তুলনামূলক শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা ছাড়েন।
বিলাসী জীবন: প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন আধুনিক প্রাসাদের মতো। ভিআইপি জীবনযাপন ও বিশেষ সুবিধা ছিল তার দৈনন্দিন অংশ।
বর্তমান করুণ পরিণতি: এখন সীমিত দায়িত্বে আছেন। তবে তরুণদের চোখে তিনি দুর্নীতির প্রতীক, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রায় শেষ।
দক্ষিণ এশিয়ার শেখ হাসিনা, ওলি ও রাজাপাক্ষে যেমন আন্দোলনের মুখে ভেঙে পড়েছেন, মঙ্গোলিয়ার ঘটনাও দেখায়—গণআন্দোলন, বিশেষত তরুণদের ক্ষোভ, স্বৈরাচার বা দুর্নীতিকে শেষ পর্যন্ত মাটিতে নামিয়েই দেয়।
যেখানে একসময় ছিল প্রাসাদ, প্রটোকল আর ক্ষমতার দাপট—আজ সেখানে অনিশ্চয়তা, নির্বাসন ও জনরোষের মুখোমুখি বাস্তবতা।
লেখক: নিপুণ চন্দ্র, মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক বর্তমান বাংলা


