logo
ads

শুধু ছাত্র রাজনীতি নয়, জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা

হিরণ্ময় হিমাংশু

প্রকাশকাল: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১১:২৪ এ.এম
শুধু ছাত্র রাজনীতি নয়, জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্ররাজনীতির দিকনির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এখানে জয় মানে কেবল ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তার নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও একটি শক্তিশালী বার্তা পাঠানো। তাই প্রতিটি নির্বাচনেই ডাকসুর ফলাফলের রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকে গভীর। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ছাত্রদলের জয়ী হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শিবিরের কাছে পরাজয়—এটি শুধু ছাত্র রাজনীতির জন্য নয়, জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। প্রশ্ন উঠেছে, কেন এমন হলো? এই লেখায় আমরা সেই কারণগুলো বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।

১. সংগঠনের ভেতরে বিভক্তি

ছাত্রদলের পরাজয়ের সবচেয়ে বড় কারণ তাদের ভেতরের বিভক্তি। দীর্ঘদিন ধরে দেখা যাচ্ছে—ছাত্রদলের মধ্যে দ্বন্দ্ব, অস্থিরতা এবং নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন বিদ্যমান। অনেকেই মনে করেন, কেন্দ্র থেকে সঠিক নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা না আসায় মাঠ পর্যায়ের নেতারা একক কৌশল নিয়ে চলতে পারেননি। এর ফলে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ শক্তি গড়ে উঠতে পারেনি। অন্যদিকে শিবির তাদের সাংগঠনিক ঐক্য বজায় রাখতে পেরেছে।

২. প্রার্থীদের বাছাইয়ে দুর্বলতা

নির্বাচনে জয়লাভের অন্যতম শর্ত হলো যোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও কর্মীবান্ধব প্রার্থী বাছাই। ছাত্রদল তাদের প্রার্থী নির্ধারণে স্পষ্ট কৌশল দেখাতে পারেনি। অনেকে অভিযোগ করেছেন, প্রার্থীরা ছাত্রদের দৈনন্দিন সমস্যা, বিশেষ করে আবাসন ও একাডেমিক অনিয়ম ইস্যুতে দৃঢ় অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। অপরদিকে শিবিরের প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে সংগঠনের প্রতি অনুগত এবং দীর্ঘদিনের তৃণমূল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় শিক্ষার্থীদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

৩. ইস্যুভিত্তিক রাজনীতির অভাব

ডাকসু নির্বাচন সবসময়ই ইস্যুভিত্তিক রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে হয়েছে। আশির দশকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন, নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচার বিরোধী লড়াই—এসবই ছাত্ররাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনে ছাত্রদল এমন কোনো সুস্পষ্ট ইস্যু শিক্ষার্থীদের সামনে তুলতে পারেনি। তাদের প্রচারণা মূলত জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলনেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ক্যাম্পাসের বাস্তব সমস্যা—আবাসন সংকট, টিউশন ফি বৃদ্ধি, নিরাপত্তাহীনতা, যৌন হয়রানি, কিংবা গবেষণা সুবিধার অভাব—এসব ইস্যুতে তারা শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে। শিবির এই শূন্যতাকে ব্যবহার করেছে দক্ষতার সঙ্গে।

৪. শিবিরের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি

শিবিরের শক্তি হলো তাদের দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক প্রস্তুতি। তারা নিয়মিত সদস্য সংগ্রহ, রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ এবং আদর্শভিত্তিক কর্মসূচি চালিয়ে গেছে। ফলে নির্বাচনের আগেই তারা একটি নিবেদিতপ্রাণ ভোটারভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ছাত্রদল যেখানেই আকস্মিক উদ্দীপনার ওপর নির্ভর করেছে, শিবির সেখানে নিয়মিত কাজের ফল ঘরে তুলেছে।

৫. কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রভাব

ছাত্র রাজনীতি সবসময়ই কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রতিফলন। জাতীয় পর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা, ধারাবাহিক আন্দোলনে ব্যর্থতা এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ছাত্রদলকেও প্রভাবিত করেছে। ভোটারদের অনেকেই মনে করেছেন, যেই রাজনৈতিক দল জাতীয় পর্যায়ে টিকে থাকতে পারছে না, তাদের ছাত্রসংগঠন থেকেও ইতিবাচক কিছু আশা করা কঠিন। এই প্রেক্ষাপটে শিবির নিজেদেরকে তুলনামূলক বেশি সংগঠিত ও আদর্শভিত্তিক হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছে।

৬. ক্যাম্পাসভিত্তিক সাংস্কৃতিক প্রভাব

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। নাটক, সংগীত, বিতর্ক কিংবা সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রগুলোতে ছাত্রদলের তেমন কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি ছিল না। ফলে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের তরুণ ভোটাররা তাদের প্রতি আস্থা রাখতে পারেননি। শিবির যদিও সরাসরি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ততটা সক্রিয় নয়, কিন্তু তারা নির্দিষ্ট ‘মূল্যবোধ’ প্রচারের মাধ্যমে একটি প্রভাব বিস্তার করেছে।

৭. প্রচারণার কৌশলে ঘাটতি

আধুনিক নির্বাচনে প্রচারণার কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল পোস্টার, ভিডিও বার্তা—এসব শিক্ষার্থীদের কাছে বার্তা পৌঁছানোর কার্যকর মাধ্যম। ছাত্রদল এই সুযোগকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারেনি। তাদের প্রচারণা ছিল খণ্ডিত এবং অনিয়মিত। অপরদিকে শিবির সুপরিকল্পিতভাবে তাদের বার্তা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

৮. সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা হারানো

ছাত্রদল অতীতে একাধিকবার সহিংসতায় জড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী মনে করেন, ছাত্রদলের নেতারা মূলত জাতীয় দলের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নেই বেশি ব্যস্ত, শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে নয়। এই নেতিবাচক ভাবমূর্তি নির্বাচনে ভোটারদের আস্থাকে দুর্বল করেছে।

৯. বিরূপ পরিবেশে শিবিরের অভিযোজন

বিগত কয়েক বছরে শিবিরকে প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাপে ক্যাম্পাস থেকে কার্যত সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা গোপনে সাংগঠনিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখেছে এবং সুযোগ পেলেই তা কাজে লাগিয়েছে। ফলে নির্বাচন আসতেই তারা সংগঠিত শক্তি হিসেবে মাঠে নামতে পেরেছে। ছাত্রদল ভেবেছিল, শিবির মাঠে নেই, তাই জয় সহজ হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন প্রমাণিত হয়েছে।

১০. শিক্ষার্থীদের ‘বিকল্প খোঁজা’ মানসিকতা

অনেক শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ বা ছাত্রদলের বাইরে একটি বিকল্প খুঁজছিল। তাদের কাছে শিবিরই সেই বিকল্প হিসেবে হাজির হয়েছে। ছাত্রদল যদি সত্যিকারের বিকল্প হতে চাইত, তবে তাদের সাংগঠনিক দক্ষতা, কর্মসূচি এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে হতো। কিন্তু তারা তা পারেনি।

উপসংহার

ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শিবিরের কাছে হারের পেছনে বহুমাত্রিক কারণ রয়েছে—অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, দুর্বল প্রার্থী, ইস্যুভিত্তিক রাজনীতির অভাব, শিবিরের দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক প্রস্তুতি, কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রভাব এবং প্রচারণার দুর্বলতা। এই পরাজয় কেবল একটি নির্বাচন হারার বিষয় নয়; এটি ছাত্রদলের জন্য আত্মসমালোচনার বড় সুযোগ। যদি তারা ভবিষ্যতে আবারও প্রতিযোগিতামূলক শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে চায়, তবে তাদের সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করা, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সমস্যা তুলে ধরা এবং সাংস্কৃতিক-একাডেমিক ক্ষেত্রেও সক্রিয় হতে হবে।

অন্যদিকে শিবিরের এই জয় দেখিয়ে দিয়েছে যে—দীর্ঘ সময় প্রান্তিক অবস্থায় থেকেও সাংগঠনিক ঐক্য ও আদর্শিক দৃঢ়তা বজায় রাখলে সুযোগের সময় জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কে কতটা দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিতে পারে এবং শিক্ষার্থীদের আসল ইস্যুগুলোকে কেন্দ্র করে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে তার ওপর।

এই বিভাগের আরও খবর

dainikamarbangla

সর্বশেষ খবর

হাইলাইটস

বিশেষ সংবাদ