বাংলাদেশে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। একইসঙ্গে দেশের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়ানো হচ্ছে। গ্যাস সংকট, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি সমস্যার কারণে এই পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে খাতসংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত থেকে আসা বিদ্যুতের বড় অংশই আসছে আদানি পাওয়ারের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানি বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। এ সময়ে ক্রমবর্ধমান চাহিদার সিংহভাগ মেটানো হয়েছে আদানির বিদ্যুৎ দিয়ে।
গ্যাস নির্ভরতা কমছে
গত এক দশকে (২০১০–২০২০) বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ মিটেছে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও ব্যয় সংকটের কারণে বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমছে। সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি–জুলাইয়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে।
অন্যদিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমেছে। ৩০ দশমিক ১ শতাংশ থেকে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ২ শতাংশে।
বিকল্প হিসেবে আমদানি ও তেল
বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, চাপজনিত কারিগরি ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে অনেক গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি চালু রাখা সম্ভব হয়নি। সরকারের হাতে বিকল্প তেমন ছিল না। বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে ও সম্ভাব্য ব্ল্যাকআউট ঠেকাতে ভারত থেকে আমদানি বাড়ানো ছাড়া উপায় ছিল না।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে বিদ্যুৎ আমদানি দেশের মোট চাহিদার ৯ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও ১১ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ মত
সামিট পাওয়ারের পরিচালক আদিবা আজিজ খান বলেন, “এটি মূলত খরচ সাশ্রয়ের বিষয়। গ্যাসের প্রয়োজন সার শিল্পে। যেখানে তেল ও বিদ্যুৎ আমদানির মতো বিকল্প উৎস থেকে তুলনামূলক সস্তায় বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।” তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন নাও দেখা যেতে পারে।
‘ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস’-এর (IEEFA) বাংলাদেশভিত্তিক বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, মার্চ মাস থেকে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। তাই সরকারকে বাধ্য হয়ে আমদানি ও তেলভিত্তিক উৎপাদন বাড়াতে হয়েছে।
এলএনজি আমদানির চিত্র
আন্তর্জাতিক অ্যানালাইটিকস ফার্ম কেপলারের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি বেড়েছে ২৪ শতাংশ। তবে এর পরও সরকারি তথ্য অনুযায়ী গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ।
দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় আমদানি বাড়ানো এখন সরকারের প্রধান ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এ নিয়ে খরচ বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা—এসব দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে বিশেষজ্ঞদের মনে।


